জামালপুর প্রতিনিধি: জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দর যেন এখন অস্তিত্ব সংকটে। গত ঈদুল আজহার ছুটিতে সাত দিনের জন্য বন্ধ হওয়া এই বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় তিন মাসেও আর চালু হয়নি। ফলে একদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব, অন্যদিকে বন্দরের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৮ হাজার শ্রমিক-ব্যবসায়ী পড়েছেন চরম বিপাকে। দীর্ঘদিন ধরে পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় খাঁ খাঁ করছে পুরো বন্দর, পড়ে আছে শত শত পাথর ভাঙার ক্রাশার মেশিন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পাথরের সঙ্গে আসা মাটি ও বালুর ওপর শুল্ক আরোপ, অতিরিক্ত চার্জ, ভারতীয় অংশের সড়কের বেহাল দশা এবং আমদানি-রপ্তানিকারকদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে এ বন্দরে ব্যাবসা করা দিন দিন লোকসানজনক হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে আমদানি বন্ধ রেখেছেন তারা। অন্যদিকে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, ব্যবসায়ীদের বারবার আমদানিতে ফিরতে বলা হলেও লোকসানের আশঙ্কায় তারা পাথর আনছেন না।
ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন ও বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় পাঁচ মাস এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ছয় মাস বন্ধ ছিল বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও এখন পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ। অর্থাৎ বছরের উল্লেখযোগ্য সময়ই কার্যত অচল থাকছে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই স্থলবন্দর। দীর্ঘ সময় বন্দর বন্ধ থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়ে সরকারকেও বছরে কয়েক কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
১৯৭৪ সালে ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা ধানুয়া কামালপুরে ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করে এ স্থলবন্দর। পরে ২০১৫ সালের ২১ মে এটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপ নেয়। বন্দরে ইমিগ্রেশন চালুর লক্ষ্যে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামোও নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি না থাকায় সেই অবকাঠামোর সুফল মিলছে না। এই বন্দর দিয়ে পাথর, কয়লা, চুনাপাথর, গবাদিপশু, মাছের পোনা, তাজা ফলমূল, গাছগাছড়া ও উদ্ভিদ, বীজ, গম, পেঁয়াজ, আদা, মরিচ, রসুন, কাঁচা সুপারি, কাঠ ও রাসায়নিক সারসহ প্রায় ৩৪ ধরনের পণ্য আমদানির অনুমোদন রয়েছে। অথচ বাস্তবে বর্তমানে মূলত পাথর আমদানির ওপরই নির্ভরশীল বন্দরটি। অন্যান্য পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক ও খরচের কারণে সেগুলোর আমদানিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, বন্দর চালুর পর ধানুয়া কামালপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ৭-৮ হাজার মানুষ পাথর ভাঙা, ট্রাক শ্রমিক, হোটেলসহ নানা পেশায় যুক্ত হন। বন্দরের পণ্যবাহী কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় সরাসরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এসব শ্রমিক। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকে সংসার চালাতে ঋণ করছেন, কিস্তি দিতে পারছেন না; অনেক পরিবারে নেমে এসেছে চরম আর্থিক সংকট।
পাথর ভাঙা শ্রমিক খোকন মিয়া বলেন, “আমদানি বন্ধ, আমাদের কাজও বন্ধ। সংসার চালাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে গেছি। বাজার করতে পারছি না, কিস্তিও চালাতে পারছি না। দ্রুত পাথর আমদানি শুরু না হলে আমাদের পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।”
পাথর ব্যবসায়ী মো. মাহফুজুল হক বলেন, “পাথরের সঙ্গে আসা মাটির শুল্ক ও অতিরিক্ত চার্জ বন্ধ না হলে আমদানি চালু করা কঠিন। আমদানি বন্ধ থাকায় সাত-আট হাজার শ্রমিকসহ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বন্দর রক্ষায় শুল্ক বিভাগকে বাস্তবসম্মত ছাড় দিতে হবে।”
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিকাশ দত্ত বলেন, “বছরের বেশির ভাগ সময়ই এই বন্দরের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকে। বছরে তিন-চার মাস আয় করে শ্রমিকদের পক্ষে সারা বছর সংসার চালানো সম্ভব নয়। পাথরের সঙ্গে বালু আসায় সেই বালুরও শুল্ক দিতে হয়। এসব কারণে ব্যবসায়ীরা আমদানি করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।”
এদিকে ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আবুল হোসেন আকন্দ বলেন, “ভারতীয় অংশে ভাঙা সড়ক মেরামতের কাজ চলছে। পাশাপাশি লোকসানের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় আমদানি বন্ধ রয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের বারবার আমদানির জন্য বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, দ্রুত আমদানি চালু হবে বলে আশা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আগামী এক মাসের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু না হলে এ স্থলবন্দর বন্ধের সুপারিশ পাঠানোর নির্দেশনা রয়েছে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available