• ঢাকা
  • |
  • সোমবার ৯ই আষাঢ় ১৪৩১ রাত ০৩:৩৯:৩১ (24-Jun-2024)
  • - ৩৩° সে:
এশিয়ান রেডিও
  • ঢাকা
  • |
  • সোমবার ৯ই আষাঢ় ১৪৩১ রাত ০৩:৩৯:৩১ (24-Jun-2024)
  • - ৩৩° সে:

সারাবাংলা

সঙ্কটে হারিয়ে যেতে বসেছে গাইবান্ধার মৃৎশিল্প

২৩ মে ২০২৩ বিকাল ০৫:১৫:৫২

সঙ্কটে হারিয়ে যেতে বসেছে গাইবান্ধার মৃৎশিল্প

মাসুম লুমেন, গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প এখন কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে । নানান সমস্যায় জর্জরিত এ শিল্প পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখন সঙ্কটের মুখে। একইসাথে সারাবছর কাজ না থাকায় অলস সময় পার করছেন এই মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত লোকজন। অনেকেই আবার বাধ্য হয়ে পরিবর্তন করছেন বাপ-দাদার এ পেশা।

সীসা, মেলামাইন, প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পণ্যের ভিড়ে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেনা ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি। তারপরও অনেকেই তাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনো কাজ করছেন মাটি আঁকড়ে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাদিয়াখালি ইউনিয়নের পালপাড়া, খোলাহাটি ইউনিয়নের কুমারপাড়া এবং ঘাঘোয়া ইউনিয়নের রুপার বাজার মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্রের জন্য প্রসিদ্ধ। এছাড়া জেলার পলাশবাড়ী, সাদুল্লাপুর ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলাসহ জেলায় প্রায় তিন শতাধিক মৃৎশিল্প পরিবার রয়েছে। তথ্য হালনাগাদ না থাকায় নিবন্ধিত মৃৎশিল্পীদের প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কেউ মাটি ছেনে তৈরি করছেন, কেউ আবার সুনিপুণ হাতে সেই মাটি দিয়ে বিভিন্ন আকারের হাঁড়ি-পাতিল, ফুলের টব, মাটির ব্যংকসহ নানা ধরনের খেলনা তৈরি করছেন। পণ্য তৈরি হলে প্রথমে সেগুলো রোদে শুকাতে দেওয়া হয়। শুকানো হয়ে গেলে, পণ্য ভেদে দেওয়া হয় লাল, নীল, কালোসহ বিভিন্ন রঙ। এরপর নানা রঙে রঙিন হয়ে ওঠা এসব পণ্য বিক্রির জন্য ঘরে তাক করে সাজিয়ে রাখা হয়। এই কুমার পল্লীতে নারী-পুরুষ উভয়ই সমান তালে কাজ করেন। তবে অনেক মৃৎশিল্পীর বাড়িতে গিয়ে তাদের অলস বসে থাকতে দেখা গেছে। আবার, দুই-একটি বাড়িতে আধুনিক মেশিন দিয়ে নানা ধরনের নকশায় মাটির বিভিন্ন আকারের ফুলদানি তৈরি করতেও দেখা গেছে।

তবে এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত কয়েকজন এ প্রতিবেদককে জানান, বৈশাখের পর কয়েকশ মৃৎশিল্পীর পরিবার এখন হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। মহাজনের অর্ডার না থাকায় তাদের হাতে নতুন কোনো কাজ নাই। কমদামি প্লাস্টিকের পণ্যের কারণে এসব মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি কমে গেছে। ক্রেতা- বিক্রেতার সমাগম না থাকায় কুমার পল্লীর কারিগররা এখন বেকার সময় পার করছেন। কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন অনেক মৃৎশিল্পীর পরিবার।

সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পী ধীরেন্দ্র নাথ পাল জানান, আগে মাটির তৈরি কলসি, হাঁড়ি, পাতিল, সরা, মটকা, ফুলের টব, ছোটদের খেলনাসহ নানা সামগ্রী বিক্রি হতো, তাই এগুলোই আমরা বেশি তৈরি করতাম। কিন্তু এখন প্লাস্টিক-মেলামাইন জাতীয় পণ্যে বাজারে সয়লাব। সেসবের পন্যের দামও তুলনামূলক কম, তাই প্রতি ঘরে ঘরে এসব সামগ্রীর ব্যবহার বেড়ে গেছে। এ কারণে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে।

কুমারপাড়া পল্লীর আরেক মৃৎশিল্পী নমিতা রানী বলেন, মাটির জিনিস এখন আর মানুষ  আগের মত কেনেনা। বৈশাখের পর এ পর্যন্ত আর কোন কাস্টমার আসে নাই। মাটি কিনতেও এখন টাকা লাগে। অনেকেই মেশিন দিয়ে কাজ করছে। টাকা না থাকায় মেশিন কিনে কাজ করতে পারছিনা। আগের তুলনায় এখন দশ ভাগের এক ভাগও বিক্রি হয় না।

সদর উপজেলার বাদিয়াখালি ইউনিয়নের মৃৎশিল্পী নিরধ চন্দ্র অনেকটা আক্ষেপের সুরে বলেম, কষ্ট করে হলেও বাপ-দাদার এই জাত ব্যবসা আজও ধরে রেখেছি। সব বাড়িতে একসময় মাটির তৈরি জিনিসের অনেক  চাহিদা ছিল, তবে এখন বেচাকেনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পেটের তাগিদে এই পাল পাড়ার অনেকেই এ কাজ ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাদিয়াখালি পাল পাড়ার বাসিন্দা এবং জেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার পাল বলেন, শত শত পরিবার আগে এই পেশার সাথে জড়িত ছিল। গোটা গাইবান্ধায় এই পাড়ার সুনাম ছিল। এখন হাতে গোনা ৩০ থেকে ৩৫টি পরিবার এই পেশা ধরে রেখেছে। মাটির তৈরি খাবার প্লেট, হাঁড়ি-পাতিল ও অন্যান্য তৈজসপত্র স্বাস্থসম্মত হলেও বিষাক্ত প্লাস্টিকের আগ্রাশনে এটি এখন হাড়িয়ে যেতে বসেছে। বিসিক থেকে আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে লোনের ব্যবস্থা করা গেলে আশা করা যায় এ শিল্প আবার ঘুড়ে দাড়াবে। তা না হলে আমাদের এলাকা থেকে একসময় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

গাইবান্ধা জেলা বিসিক কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপক রবিন্দ্র চন্দ্র রায় বলেন, ঢাকায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে মৃৎশিল্পিদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহয়তাসহ ক্ষুদ্র ঋণ দেয়ার মাধ্যমে তারা আধুনিক ডিজাইনের ফুলের টবসহ বিভিন্ন তৈজসপত্র তৈরি করছেন। মৃৎশিল্পের সাথে জড়িতদের তথ্য সংগ্রহ করে নিবন্ধনের আওতায় আনার কাজ চলছে। তারা চাইলেই আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে লোনের ব্যবস্থা করা হবে।

জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমান জানান, সমাজে পিছিয়ে পরা অন্যান্য সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অনুদানের বিষয় নিয়ে মৃৎশিল্পের কথাও সমানভাবে চিন্তা করা হচ্ছে। বিসিকের মাধ্যমে তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। যদি মৃৎশিল্পীদের মধ্যে কোনো দুস্থ ও অসহায় পরিবার থাকে, তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করবো।
 

Recent comments

Latest Comments section by users

No comment available

সর্বশেষ সংবাদ