• ঢাকা
  • |
  • সোমবার ২রা চৈত্র ১৪৩২ সকাল ১১:০১:০২ (16-Mar-2026)
  • - ৩৩° সে:

সারাবিশ্বে চন্দ্রতারিখে পার্থক্য: কারণ ও করণীয়

১৬ মার্চ ২০২৬ সকাল ০৯:৩৭:৫৭

সারাবিশ্বে চন্দ্রতারিখে পার্থক্য: কারণ ও করণীয়

অনলাইন ডেস্ক: এটি একটি অকাট্য ও চোখে দেখা বাস্তবতা যে গোটা পৃথিবীর জন্য চাঁদের উদয়স্থল অভিন্ন নয়, বিভিন্ন। অর্থাৎ চাঁদ যখন প্রথম দৃষ্টিগোচর হয় তখন একই রাতে তা গোটা পৃথিবীবাসীর দৃষ্টিগোচর হওয়া সম্ভব নয়, বরং আগে-পরে হয়। চাঁদের যেহেতু নিজস্ব আলো নেই, বরং সূর্যের আলো তার কিছু অংশে পড়ার কারণে তার আলোকিত অংশ পৃথিবী থেকে দেখা যায়। আর চাঁদের প্রাথমিক রাতসমূহের আলোকিত অংশটি বাঁকা হয়ে থাকে। এমনকি প্রথম রাতের দৃশ্য অংশটি সাধারণত অনেক চিকনও হয়ে থাকে, তাই সকল এলাকা থেকে ওই অংশটি সমভাবে দেখা যায় না।

স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমের দেশগুলোতে চাঁদ আগে দেখা যায়। উদাহরণত, সৌদিতে সন্ধ্যা ৭টায় সূর্য ডুবার পর সেখানে চাঁদ দেখা গেল। তার এক ঘণ্টা পর মিসরে সন্ধ্যা হলে সেখানে দেখা যাবে। সৌদির দুই ঘণ্টা পর তিউনিসিয়ায় সন্ধ্যা হলে সেখানে চাঁদ দেখা যাবে। সৌদির তিন ঘণ্টা পর লন্ডনে সন্ধ্যা হবে, চাঁদটা সেখানে দেখা যাবে। এভাবে পশ্চিম দিকে ঘুরতে ঘুরতে ২১ ঘণ্টা পর বাংলাদেশে সন্ধ্যা হবে এবং সেই সন্ধ্যায় স্বাভাবিকভাবে চাঁদটা বাংলাদেশের আকাশে দেখা যাবে। এ নিয়মেই বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশের আকাশে চাঁদ দেখা যায়। আর এটাই চাঁদ দেখা যাওয়ার স্বাভাবিক পদ্ধতি, যা বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত।

Ad
Ad

কখনো কখনো অক্ষাংশের দূরত্বের কারণে এর ব্যতিক্রমও হয়ে থাকে। তাই অনেক সময় এমন হয়, একটি এলাকা থেকে চাঁদ দেখা গেল, কিন্তু একই দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত শহর যা অক্ষাংশে তার থেকে সামান্য দূরে রয়েছে তাতে চাঁদ দেখা যায়নি। অথচ ওই এলাকা থেকে আরো দূরবর্তী কোনো এলাকায় চাঁদ ঠিকই দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ, একই দ্রাঘিমা রেখায় অবস্থিত শহরগুলোতে শুধুমাত্র অক্ষরেখার দূরত্বের কারণেও চাঁদ দেখায় ব্যত্যয় হতে পারে।

Ad

একটি প্রশ্ন ও তার জবাব

সবাই জানে সৌদির সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবধান তিন ঘণ্টা, আর এখানে বলা হলো ২১ ঘণ্টা। এর জবাব হলো- সূর্য আমাদের দেশ থেকে সৌদিতে যেতে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। আর সৌদি থেকে সূর্য আবার আমাদের দেশে আসতে ২১ ঘণ্টা সময় লাগে। ২১ + ৩ = ২৪ ঘণ্টা হয়ে যায়। ঠিক তেমনি চাঁদ সৌদি থেকে আমাদের দেশে, পশ্চিম দিক থেকে ঘুরে আসতে ২১ ঘণ্টা সময় লাগে। যদি চাঁদ পূর্বদিকে ঘুরত, তাহলে তিন ঘণ্টার মধ্যে চলে আসতে পারত। একারণেই মূলত সৌদির সাথে বাংলাদেশের চাঁদ দেখায় এক দিনের ব্যবধান হয়ে যায়।

অন্য দেশের চাঁদের খবর গ্রহণ করার শর্তসমূহ

সকল আলেম কোরআন-সুন্নাহের ভিত্তিতে এ কথার ওপর একমত যে অন্য দেশের চাঁদ দেখার সংবাদ সংগ্রহ করা জরুরি নয়। তাছাড়া এক এলাকার চাঁদ অন্য এলাকায় গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য একাধিক শর্ত রয়েছে :

১. অন্য এলাকা থেকে চাঁদের খবর নির্ভরযোগ্যসূত্রে পৌঁছতে হবে।

২. প্রেরিত এলাকার উলুল-আমর বা দায়িত্বশীলদের নিকট খবরটি আস্থাভাজন হওয়ার পর তারা তা গ্রহণ করে ঘোষণা দিতে হবে।

যদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণা না দেওয়ার কারণে কোনো দেশের অধিকাংশ মানুষ চাঁদের খবর গ্রহণ না করে, তাহলে কেউ বিচ্ছিন্নভাবে ওই খবর গ্রহণ করে তদনুযায়ী মানুষকে আমলের দাওয়াত দিয়ে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করা জায়েয নয়। এটি ওলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত, এতে কারো দ্বিমত নেই। (তাবঈনুল হাকায়েক ১/৩২১)

সারাবিশ্বে একসাথে রোজা-ঈদ পালনে অসুবিধা

পশ্চিমের দেশগুলোর চাঁদের দর্শন অনুসারে অন্যান্য দেশে আমল করা সম্ভব হয় না বিভিন্ন জটিলতার কারণে, যথা :

১. আরবের চাঁদ অনুসারে বিশ্বের সবাই রোজা শুরু করতে গেলে সন্ধায় যখন আরবে চাঁদ দেখা যায়, তখন পূর্বের অনেক দেশের মানুষ গভীর রাতে ঘুমে থাকে, এমনকি একেবারে পূর্বের কিছু দেশে যথা—মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ ইত্যাদিতে রাতের শেষ প্রহরের সামান্য কিছু সময় বাকী থাকে, এমতাবস্থায় তারা তারাবিহ পড়বে কখন এবং সাহরি খাবে কখন? এরূপ আরো বিবিধ জটিলতা তৈরি হয়। অবশ্য এ জটিলতাটি বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক কম অনুভূত হয়।

২. চাঁদের খবরের সূত্রের অনির্ভরযোগ্যতাও অনেক ক্ষেত্রে দায়ী থাকে। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের নিকট ওই খবর বিভিন্ন কারণে আস্থা অর্জন করতে পারে না।

৩. খেলাফতব্যবস্থা না থাকার কারণে কর্তৃত্ব ও কর্তৃপক্ষের বিচ্ছিন্নতা এবং সমগ্র পৃথিবীর মুসলিম রাষ্ট্র পরিচালকদের পরষ্পর এক দেশের সাথে অন্য দেশের সমন্বয়হীনতাও এক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী।

মূল কথা হলো, সারা বিশ্বে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালনে শরিয়ত বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। বরং নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর পৌঁছার মাধ্যমে দায়িত্বশীলদের নিকট আস্থাভাজন হলে এবং তা পালন সহজ হলে কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুসারে বিধান আরোপিত হবে। আর যদি নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর না পৌঁছে, কিংবা দায়িত্বশীলদের নিকট আস্থাভাজন না হয়, তাহলে অন্য দেশে চাঁদ উঠলেও সারা বিশ্বের সবাই একসাথে পালন করার কোনো আবশ্যিকতা শরিয়তে নেই।

সৌদি আরবের অনুসরণ আবশ্যক হওয়ার দাবি ভিত্তিহীন

আমাদের দেশে কিছু ভাইয়েরা এমন দাবী করছে যা কোরআন-সুন্নাহ ও ফোকাহায়ে কেরামের মতের সাথে মিলে না। তাদের দাবী হলো— পৃথিবীর যে কোনো অঞ্চল থেকে চাঁদের সংবাদ যে কোনো মাধ্যমেই প্রচারিত হলে সারাবিশ্বে তদনুযায়ী আমল করা আবশ্যক। এমনকি সৌদির চাঁদের খবর সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হলেই স্ব স্ব দেশে নির্ভরযোগ্য হেলাল-কমিটি থাকলেও তাদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সৌদির খবরের উপর আমল করতে হবে- এ হলো তাদের দাবী।

এক্ষেত্রে তারা ফোকাহায়ে কেরামের প্রদত্ত সর্বসম্মত শর্তসমূহেরও কোনো তোয়াক্কা করে না। অথচ সর্বদা সৌদিআরবেই সর্বপ্রথম চাঁদ দেখা যায় এমন নয়, বরং সৌদিআরবের আগেও কখনো কখনো অন্য দেশে চাঁদ দেখা যেতে পারে, যেমন, ১৪৪৩ হি.-এর (২০২২ ঈ.) ঈদুল ফিতরের চাঁদ পৃথিবীতে সর্বপ্রথম আফগানিস্তান, নাইজার ও মালিবাসী দেখেছে। এর পরদিন সৌদিসহ অন্যান্য পশ্চিমা রাস্ট্রসমূহে দেখা গেছে। তাহলে তো এক্ষেত্রে সৌদিআরবের সাথে ঈদ করলেও তাদের দাবী অনুসারেই সর্বপ্রথম চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল হলো না।

আগের যুগে কি প্রচার ও যোগাযোগ-ব্যবস্থা ছিল না?

অনেকে বলে যে আগের যুগে তো যোগাযোগের উন্নত ব্যবস্থা ছিল না। এই সীমাবদ্ধতার কারণে বাধ্য হয়ে তাঁরা নিজ নিজ এলাকার চাঁদের ভিত্তিতে আমল করতেন। আর এখন তো বিশ্বায়নের যুগে হাতের মুঠোয় সারাবিশ্ব, তাই এখন আর পূর্বের বিধান প্রযোজ্য হবে না।

এ কথা ভুল, কেননা, প্রচারব্যবস্থা ইসলামের শুরুর যুগ থেকে সব যুগেই কমবেশি ছিল। প্রত্যেক যুগেই তার পূর্ববর্তী যুগ থেকে উন্নত থেকে উন্নততর ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। খলিফা আবু বকর (রা.)-এর যুগেও ডাকের ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থা উন্নতি করেছে। আরবে ‘ঘোড়ার ডাক’ অনেক প্রাচীন। ডাকপিয়নের রাতদিন লাগাতার দ্রুতগতিতে সফর করতে হত। কয়েক মাইল পরপর তাজাদম ঘোড়া প্রস্তুত থাকত। আরবে ডাকব্যবস্থা প্রাচীনকালে কত উন্নত ছিল সে বিষয়ের আলোচনা ইতিহাসে রয়েছে। আগের যুগে প্রচলিত ‘আকাশ-ডাকে’র এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকার ‘পায়রার ডাক’সহ বিভিন্ন প্রকারের ডাক-ব্যবস্থা ছিল।

ঐতিহাসিক মাকরীজি রহ. (মৃত্যু : ৮৪৫হি.) লিখেন : ২৬১ হিজরিতে আফ্রিকায় যে সময় ইব্রাহিম বিন মুহাম্মদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হল, তখন তিনি সমুদ্রতীরে ধারাবাহিকভাবে কয়েক মাইল পর-পর দূর্গ ও চৌকি স্থাপন করেন। তখন দূর্গে আগুন প্রজ্বলিত করার মাধ্যমে সাবতা থেকে ইস্কান্দারিয়া পর্যন্ত এক রাতেই সংবাদ পৌঁছে যেত। অথচ সাবতা আর ইস্কান্দারিয়ার মাঝে ৪ হাজার ২৭৯ কিলোমিটারের দূরত্ব। (আলমাওয়ায়েজ ওয়াল ইতিবার ১/৩২২) এমনিভাবে ইস্কান্দারিয়া থেকে তারাবলুসে রাতে কয়েক ঘণ্টায় খবর পৌঁছে যেত। উভয় শহরের মাঝে দূরত্ব মোট ১৮৮২ কিলোমিটার। (আলমুজিব ফী তালখীসি আখবারিল মাগারিব পৃ. ২৫০)

একই দিনে ঈদ করার ওপর কি মুসলিম ঐক্য নির্ভরশীল?

কোনো কোনো ভাই বলতে চান যে সারা বিশ্বে একই দিনে রোজা শুরু ও ঈদ করার ওপর মুসলিমদের ঐক্য নির্ভরশীল, তাই তা আবশ্যক। এটি একটি অবাস্তব কথা, কেননা বর্তমানে আমরা দেখছি যে, এই ঐক্যের নামে তারাই বরং নিজ দেশের মুসলিম জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন। এক্ষেত্রে মুসলিমদের ঐক্যের জন্য এটিই কল্যাণকর যে, প্রত্যেক দেশের মুসলিমগণ স্ব স্ব দেশের নির্ভরযোগ্য কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুসারে আমল করবে।

অতএব, সকল মুসলিমের দায়িত্ব হলো, বিশৃঙ্খলার পথে না গিয়ে নির্ভরযোগ্য দায়িত্বশীলদের অনুসরণে স্বদেশীয় মুসলিমদের সাথে ঐক্য বজায় রেখে আমল চালিয়ে যাওয়া। তবে যদি দায়িত্বশীলরা ভুল করেন, তাহলে মুফতিয়ানে কেরাম দায়িত্বশীলদের সতর্ক করবেন এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দিবেন।

Recent comments

Latest Comments section by users

No comment available

সর্বশেষ সংবাদ


ব্রহ্মপুত্র নদে ডুবে শিশুর মৃত্যু
ব্রহ্মপুত্র নদে ডুবে শিশুর মৃত্যু
১৬ মার্চ ২০২৬ সকাল ১০:৩৭:২২


ইরান সমঝোতা করতে মরিয়া: ট্রাম্প
ইরান সমঝোতা করতে মরিয়া: ট্রাম্প
১৬ মার্চ ২০২৬ সকাল ১০:১৮:২৯








Follow Us