আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের ফ্লোরেস দ্বীপে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর হাজারো মানুষ ত্রাণ ও জরুরি সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছেন। ১৫ আগস্ট শনিবার আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এ ভূমিকম্পে অন্তত ৪৮ জন নিহত ও ১০১ জন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শত শত ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা।
দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার (বিএনপিবি) মুখপাত্র বার্তন সুয়ার পেলিতা পানজাইতান জানান, শনিবার ভোরে ভূমিকম্প আঘাত হানার পর প্রায় ৫ হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় ৩৪১টি আফটার শক অনুভূত হয়।
ভূমিকম্পে কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জরুরি সহায়তা পৌঁছানোর অন্তত একটি সড়ক এখনো চলাচলের অনুপযোগী রয়েছে।
ফ্লোরেসের উত্তর উপকূলের নাংগাহালে গ্রামের বাসিন্দা উমরি বলেন, তাদের খাবার, পানীয়, ওষুধ এবং শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দরকার। ৫৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি ভূমিকম্পের পর থেকে অন্যদের সঙ্গে একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থান করছেন। বাড়িতে ফিরতে এখনো ভয় পাচ্ছেন তারা।
একই এলাকার ৫৫ বছর বয়সী নুরহিদায়াতি জানান, ভূমিকম্পের আতঙ্ক এখনো কাটেনি। তিনি বলেন, আগের ভূমিকম্পের স্মৃতি তাকে আরও ভীত করে তুলেছে। ১৯৯২ সালে ফ্লোরেসে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট সুনামিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছিল।
নুরহিদায়াতি দ্রুত দুর্গতদের কাছে ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার মুখপাত্র বার্তন জানান, ভূমিকম্পে অন্তত ৯১৪টি বাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকশ বাড়ি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৩৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ৩৮টি সরকারি কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা।
তিনি বলেন, ভূমিকম্পের কারণে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। দুর্গতদের জরুরি তাঁবু, খাবার, ওষুধ, কম্বল, ভাঁজ করা খাট, মাদুর, বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য জেনারেটর প্রয়োজন।
স্থানীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার কর্মকর্তা ফাথুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া বা নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। উদ্ধারকারী দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ফ্লোরেসের উত্তর উপকূলের অদূরে এবং অগভীর ভূগর্ভে। ওই অঞ্চলে উঁচু ভবনের সংখ্যা খুবই কম।
পূর্ব নুসা তেংগারা প্রাদেশিক সরকার আগামী ১৪ দিনের জন্য জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন বার্তন।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিগুলোর ফেডারেশন জানিয়েছে, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা হাজারো মানুষের জন্য ত্রাণ সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ইন্দোনেশিয়া সরকার দুর্গত এলাকায় ৫০ হাজার ত্রাণ প্যাকেট পাঠিয়েছে, যেগুলোর মোট ওজন প্রায় ২৭৫ টন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেয়েনও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। এ কাজে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস উপগ্রহ ব্যবস্থার সহায়তা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
ভূমিকম্পের পর সমুদ্রের পানি সরে যেতে দেখে ফ্লোরেসের বাসিন্দারা সুনামির আশঙ্কায় উঁচু এলাকায় ছুটে যান। পরে সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার করা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে না যেতে স্থানীয়দের সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। কারণ, পরাঘাতে দুর্বল ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থা বিএমকেজির তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৬ মিটার উচ্চতার ঢেউ আঘাত হেনেছে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থানের কারণে ইন্দোনেশিয়ায় প্রায়ই ভূমিকম্প হয়। জাপান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অববাহিকা পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চলে ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির তৎপরতা বেশি।
২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উপকূলের কাছে ৯ দশমিক ১ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর সুনামি আঘাত হানে। এতে পুরো অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ নিহত হন, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজারই ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক। এটি আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি।
সূত্র: দ্য জাকার্তা পোস্ট
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available