আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ‘এম৩এম হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট ২০২৬’-এর তথ্য অনুযায়ী, মুকেশ আম্বানিকে পেছনে ফেলে ভারতের শীর্ষ ধনীর মুকুট পুনরুদ্ধার করেছেন গৌতম আদানি ও তার পরিবার। অন্যদিকে, দেশটিতে শতকোটিপতি বা ডলার বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা রেকর্ড ৩৯১ জনে পৌঁছেছে।
তালিকা অনুযায়ী, গৌতম আদানির সম্পদ ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৯ কোটি ২৩ লাখ কোটি টাকায় (প্রায় ৯,৬০০ কোটি মার্কিন ডলার)। বিপরীতে, মুকেশ আম্বানির সম্পদ ১০ শতাংশ কমে ৮ কোটি ৬৩ লাখ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। ফলে বর্তমানে দুই ধনকুবেরের মধ্যে সম্পদের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৫৯,৪০০ কোটি টাকা।
ইউরোপের বাজারে ইস্পাতের চড়া দাম ও বাণিজ্য সুরক্ষার সুবাদে লক্ষ্মী নিবাস মিত্তল ও তার পরিবারের সম্পদ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩ কোটি ৩৯ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে তারা তালিকার তিন নম্বর স্থানে উঠে এসেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চার নম্বর স্থান ধরে রেখেছেন ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউটের সাইরাস পুনাওয়ালা ও তার পরিবার। পরবর্তী স্থানগুলোতে রয়েছেন এইচসিএলের রোশনি নাদার মালহোত্রা, কুমার মঙ্গলম বিড়লা, সান ফার্মাসিউটিক্যালসের দিলীপ সাংঘভি এবং উইপ্রোর আজিম প্রেমজি।
অনিল আগরওয়াল ও তার পরিবার ২ কোটি ৮ লাখ কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে নবম স্থানে উঠে এসেছেন। অন্য দিকে, জেবি কেমিক্যালসের সাথে মার্জার সম্পন্ন হওয়ার পর সম্পদ ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় দশম স্থানে প্রবেশ করেছেন সমীর মেহতা ও তার পরিবার।
হুরুন ইন্ডিয়া উল্লেখ করেছে, "গত এক দশকের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারতের শীর্ষ ১০ ধনীর অবস্থান বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে শীর্ষ স্থানটি নিয়ে প্রতিযোগিতা ছিল সবচেয়ে তীব্র: গৌতম আদানি ও তার পরিবার ২০২২ সালে মুকেশ আম্বানিকে টপকে শীর্ষে ওঠেন, ২০২৩ সালে আবার পেছনে পড়েন, ২০২৪ সালে পুনরায় শীর্ষ স্থান পুনরুদ্ধার করেন, ২০২৫ সালে তা আবার হারান এবং ২০২৬ সালে এসে ফের প্রথম স্থানটি পুনরুদ্ধার করলেন। অর্থাৎ পাঁচ বছরে পাঁচবার শীর্ষ স্থানে রদবদল ঘটেছে।"
আদানির সম্পদের রেখাটি সবচেয়ে বেশি ওঠানামা করেছে; ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ১১ কোটি ৬২ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছানোর পর তা কমে ৮ কোটি ১৫ লাখ কোটি টাকায় নেমেছিল এবং সেখান থেকে পুনরুদ্ধার করে বর্তমানে ৯ কোটি ২৩ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৭ সালে মুকেশ আম্বানির সম্পদ যেখানে ছিল ২ কোটি ৫৮ লাখ কোটি টাকা, তা ২০২৪ সালে ১০ কোটি ১৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। তবে পরপর দুই বছর সম্পদ হ্রাস পেয়ে তা এখন ৮ কোটি ৬৩ লাখ কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে।
হুরুন আরও জানিয়েছে, "তালিকার তিন থেকে দশ নম্বর স্থানগুলোতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেছে। ২০১৭ সালে এই আটটি পরিবারের সম্পদ যেখানে ১৭,৩০০ কোটি টাকা থেকে ২ কোটি ৫৮ লাখ কোটি টাকার মধ্যে ছিল, বর্তমানে তা ১ কোটি ৮৯ লাখ কোটি টাকা থেকে ৩ কোটি ৩৯ লাখ কোটি টাকার মধ্যে সংকুচিত হয়েছে এবং তারা বারবার নিজেদের জায়গা পরিবর্তন করেছেন। এলএন মিত্তল ও তার পরিবার এক দশকের শুরুতে বেশ এগিয়ে থাকলেও ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলেন। তবে এখন তারা সরাসরি তিন নম্বরে চলে এসেছেন।"
"অনিল আগরওয়াল ও সমীর মেহতার পরিবার তালিকার তলানি থেকে উঠে এসে যথাক্রমে নবম ও দশম স্থানে পৌঁছেছেন; তাদের সম্পদ যথাক্রমে ১২.০ গুণ এবং ৭.৬ গুণ বেড়েছে। অন্যদিকে, আজিম প্রেমজি ও তার পরিবার ২০২২ সালে বড় ধরনের পতনের মুখে পড়লেও গত তিন বছরের শক্তিশালী পুনরুত্থানের মাধ্যমে অষ্টম স্থানে নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছেন।"
হুরুন জানিয়েছে, ভারতে অন্তত ১,০০০০ কোটি টাকার মালিক এমন ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৮১০ জনে, যা আগের বছরের তুলনায় ১২৮ জন বেশি। তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১২.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৭.৫ লাখ কোটি টাকায় (প্রায় ১.৯৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা ভারতের মোট অর্থনীতির প্রায় অর্ধেক। এক বছরে দেশে নতুন ২৭ জন বিলিয়নেয়ার যুক্ত হয়ে মোট সংখ্যা রেকর্ড ৩৯১ জনে পৌঁছেছে। গত পাঁচ বছরে এই সংখ্যা ২৩৭ থেকে বেড়ে ৩৯১ হয়েছে।
ভারতের ধনীদের তালিকায় প্রযুক্তির প্রভাব স্পষ্ট। এবারই প্রথম আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাত একটি স্বতন্ত্র খাত হিসেবে উঠে এসেছে, যেখানে ১৯ জন ধনীর মোট সম্পদ ৩ কোটি ৭ লাখ কোটি টাকা। বেঙ্গালুরুভিত্তিক ‘QpiAi’-এর প্রতিষ্ঠাতা নাগেন্দ্র নাগরাজা ১,৭০০ কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে দেশের প্রথম কোয়ান্টাম-কম্পিউটিং খাতের ধনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।
তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের ৭০ শতাংশই স্বনির্ভর উদ্যোক্তা (১,২৬৬ জন), যা পাঁচ বছর আগে ছিল ৫৫ শতাংশ। সেক্টর বা খাতভিত্তিক হিসেবে শিল্পজাত পণ্য খাত থেকে সবচেয়ে বেশি ১৬৬ জন, কেমিক্যাল বা রাসায়নিক খাত থেকে ১৪২ জন এবং ফার্মাসিউটিক্যালস বা ওষুধ খাত থেকে ১৩৬ জন স্থান পেয়েছেন।৪৬৫ জন ধনী নিয়ে ভারতের সবচেয়ে বড় ধনীদের শহর হিসেবে শীর্ষে রয়েছে মুম্বাই। এরপর রয়েছে নতুন দিল্লি (২৩৬ জন) এবং বেঙ্গালুরু (১২৯ জন)। তালিকায় ১৩১ জন নারী স্থান পেয়েছেন, যার মধ্যে ৩৩ জন ডলারে বিলিয়নেয়ার।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত ও প্রবাসী ধনীদের সংখ্যাও বেড়েছে; দেশটির বাইরে বসবাসকারী প্রবাসীদের সংখ্যা ১৫৬ জন, যার মধ্যে ৯০ জন যুক্তরাষ্ট্রে এবং ৩১ জন সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাস করেন। কূপিড-এর আদিত্য কুমার হালওয়াসিয়া সবচেয়ে দ্রুত সম্পদ তৈরি করেছেন; তার সম্পদ ৮৫৯ শতাংশ বেড়ে ১৮,৮০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। জিপটোর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ২৩ বছর বয়সী কৈবল্য ভোরা তালিকার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য, যার পরেই রয়েছেন তার ২৪ বছর বয়সী সহ-প্রতিষ্ঠাতা আদিথ পালিচা।হুরুন জানিয়েছে, ২০২৬ সালের এই র্যাঙ্কিং প্রকাশের সময়কাল জুড়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্পদ গড়ে প্রতিদিন ৫,৮৩৩ কোটি টাকা হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available