কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি: একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের অস্বাভাবিক দাম— প্রতিদিনের জীবিকা চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এমন বাস্তবতায় নগরে একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই এখন প্রায় অলীক স্বপ্ন। নাগরিক জীবনে নিজস্ব ঠিকানার আকাঙ্ক্ষা যেন এখন ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে চাঁদ ধরারই নামান্তর। তবুও স্থায়ী আশ্রয়ের আশা ত্যাগ করেনি মানুষ। নগরে একটি ফ্ল্যাট কেনা বা ছোট্ট জায়গা কেনার স্বপ্নে অনেকেই গড়ে তুলছেন যৌথ উদ্যোগে সমিতি। নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমিয়ে নিজেরাই কেনেন জায়গা, গড়ে তোলেন বহুতল ভবন, তারপর ভাগাভাগি করেন ফ্ল্যাট। এতে ব্যয় কম এবং ব্যাংক ঋণের চাপও থাকে না।

জানা গেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের বাড়তি সুদ এবং নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মতো ঘটনা। এসব কারণে রাজধানীতে ছোট ও মাঝারি ফ্ল্যাট বুকিং ও বিক্রি এক বছরের ব্যবধানে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে। বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ফ্ল্যাট বুকিং ও বিক্রি কমে যাওয়ায় ছোট ও মাঝারি আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। পাশাপাশি প্লট বা জমি বিক্রির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মূলত রড ও সিমেন্টের মতো কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ড্যাপ-এর কারণে ফ্ল্যাটের নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ।


কেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ‘ভালো মানের একটি ফ্ল্যাটের দাম এখন কোটি টাকার কাছাকাছি। আমরা যারা প্রতিদিনের খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছি, তাদের পক্ষে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনা অসম্ভব। তাই আমরা ৩০ জন মিলে সমিতি করেছি, মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে জমিয়ে। ধীরে ধীরে একটি জায়গা কিনেছি। এখন সবাই মিলে যৌথ উদ্যোগে নিজেদের জন্য বাড়ি করব।’
এমনই আরেকটি সমিতির সদস্য মো. হাসান বলেন, ‘আমরা ৪০ জন মিলে প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা করে দিচ্ছি। পাঁচ বছর ধরে এভাবে টাকা জমাচ্ছি। এখন জমি খুঁজছি। পরে ভবন নির্মাণ করে লটারির মাধ্যমে ফ্ল্যাট ভাগ করা হবে।’
শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সরকারি কর্মকর্তারাও এই পথে হাঁটছেন। ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পের পূর্ব পাশ ঘেঁষে প্রস্তাবিত “পদ্মা টাওয়ার” নামে একটি ভবন নির্মাণের অপেক্ষায় রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রালয়ের কর্মকর্তারা যৌথভাবে ভবনটি নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন। তাদের একজনের সাথে কথা হলে তিনি জানান, ‘সরকারি ঋণ নিয়ে জায়গা কেনা কঠিন। তাই যৌথভাবে জায়গা কিনলে ব্যয়ও কমবে, চাপও কম পড়বে।’
তবে এই যৌথ উদ্যোগকে আবাসন খাতের জন্য হুমকি বলে মনে করেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া। তাঁর ভাষায়, ‘এই পদ্ধতিতে অনিবন্ধিতভাবে ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে, এতে রাজস্ব ফাঁকি ও প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ছে। বিষয়টি এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনলে আবাসন খাত বড় সংকটে পড়বে।’
মধ্যবিত্তের জন্য নগরে ফ্ল্যাট কেনা এখন প্রায় স্বপ্নের ব্যাপার। তাই অনেকে যৌথ উদ্যোগে আশ্রয় গড়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু তাতেও আছে প্রতারণার শঙ্কা। ফলে মাথা গোঁজার একটুখানি ঠাঁই এখনো দূর আকাশের তারার মতো অধরা হয়ে আছে নগরবাসীর জীবনে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2025, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available