পিরোজপুর প্রতিনিধি: জাহাজ নির্মাণ শিল্পের এক সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলা। সন্ধ্যা নদী ও এর শাখা-প্রশাখার তীরে খালের চরে গড়ে উঠেছে ২১টি জাহাজ নির্মাণ ডকইয়ার্ড। পিরোজপুরের স্বরুপকাঠি শহর-বন্ধর- ও ভিবিন্ন খালের শাখায় গডে উঠা এসব ডকইয়ার্ড শিল্প কারখানায় তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের জাহাজ।
এ শিল্পের দিন দিন প্রসার ঘঠছে স্বরুপকাঠির ছারছিনা, কালিবাডি, বরছাকাঠি, বালিহারি, ডুবিরহাটসহ ছারছিনা, স্বন্ধ্যা নদীর শাখা খালেচরে স্টিল বডি লঞ্চ সন্ধ্যা নদীর চরে, কর্গো, ট্রলার, বাবুতোলা বলগেট ও ছোট-বড জাহাজ সহ বিভিন্ন নৌযান।
এসব ডকইয়ার্ডে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমবীবী মানুষ শ্রমবিক্রায় করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। দক্ষ কারিগরদের হাতে নির্মিত হচ্ছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন জাহাজ। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারি প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণ সুবিধা পেলে এই শিল্প আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে বলে মনে করছেন এখানকার জাহাজ নির্মান মালিক, শ্রমিক, পযটক ও স্থানীয়রা ।
সন্ধ্যা নদীর কোলঘেঁষা নেছারাবাদ, প্রাকৃতিক নদীপথকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে এখানে গড়ে উঠেছে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের এক সমৃদ্ধ জনপদ। প্রায় ৩২ বছর ধরে উপজেলার বিভিন্ন নদীতীরে রয়েছে ২১টি ডকইয়ার্ড, যেখানে নির্মিত হচ্ছে কার্গো জাহাজ, বালুবাহী জাহাজ, তেলবাহী ও ভিবিন্ন বালামালবাহী জাহাজসহ বিভিন্ন ধরনের স্টিল পাতের নৌযান।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে এসে তুলনামূলক কম খরচে উন্নতমানের জাহাজ নির্মাণ করছেন। এখানকার কারিগরদের দক্ষতায় নির্মিত কিছু জাহাজ দেশের পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটেও চলাচল করছে।
ডকইয়ার্ড সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটের তুলনায় অনেক কম ব্যয়ে ও স্বল্প সময়ে এখানে জাহাজ নির্মাণ সম্ভব। বর্তমানে তিন থেকে সাড়ে তিনশ ফুট পর্যন্ত বড় আকারের জাহাজও নির্মাণ করা হচ্ছে।
স্থনীয়রা বলেন, জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে ঘিরে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কাঠমিস্ত্রি, ওয়েল্ডার, রংমিস্ত্রি, লোহার কারিগর, সহ সংশ্লিষ্ট পেশায় জড়িত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন হাজারও মানুষ।
ঐতিহ্য, দক্ষতা ও সম্ভাবনার অনন্য সমন্বয়ে পিরোজপুরের নেছারাবাদের জাহাজ নির্মাণ শিল্প আজ নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত হলে এই শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাতে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
"কম খরচে ভালো মানের জাহাজ নির্মাণ করতে পারি বলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অর্ডার আসে। এবং জাহাজ তৈরি পরে জাহাজ নামান খরচও অনেক কম।সরকারি সহযোগিতা, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণ পেলে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য আরও উন্নতমানের জাহাজ তৈরি করা সম্ভব হবে।"
শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে জাহাজ নির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন এখানকার উদ্যোক্তারা। তবে আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন তারা।
মিস্ত্রী সৈয়দ আলী বলেন,"আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করছি। সরকার যদি আধুনিক প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে, তাহলে আরও দক্ষতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ নির্মাণ করা সম্ভব হবে।"
জাহাজ নির্মান সমিতির সভাপতি হাজী গফ্ফার বলেন, শিল্প সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সরকারি নজরদারি, প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত হলে নেছারাবাদের জাহাজ নির্মাণ শিল্প দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখবে। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দত্ত বলেন,”সরকারি সহায়তা পেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতির কথা জানিয়েছে প্রশাসন। "সরকারের পক্ষ থেকে এই শিল্পের উন্নয়নে আমরা আন্তরিক। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পূর্ণ নয়। সেগুলো সম্পন্ন হলে সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি আরও সহজ হবে। ২১টি জাহাজ নির্মাণ শিল্পই বর্তমানে চলমান”।
নেছারাবাদের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিকাশ শুধু দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিই নয়, দেশের সামগ্রিক শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে এগিয়ে নিতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ সরকার নিলে দেশের রাজস্ব আয় আরও বৃদ্ধি পাবে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available