অনলাইন ডেস্ক: আজ বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী। বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অমর এই কবিকে স্মরণে রাজধানী ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৮৯৯ সালের ২৪ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল। বাংলা সাহিত্যের এই অসাধারণ প্রতিভা ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। তাঁর লেখনীতে উঠে এসেছে শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করার সাহস।
জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, নজরুলসংগীত পরিবেশনা, পুস্তক প্রদর্শনী ও স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কবির জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারিভাবেও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচি। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
জাতীয় পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে ময়মনসিংহের ত্রিশালে। কবির স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নজরুলসংগীত পরিবেশনার আয়োজন করা হয়েছে।
রাজধানীতে বাংলা একাডেমি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সেমিনার, নজরুল পুরস্কার প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ‘দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি’ শিরোনামে তিন দিনব্যাপী বিশেষ আয়োজনের সমাপনী দিন পালিত হচ্ছে। এছাড়া নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগেও বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
শনিবার ত্রিশালে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় সত্তা, জাতীয় চেতনা ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রতীক। তিনি কবির জীবন ও কর্মকে বিশ্বপরিসরে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে ঘোষণার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও পর্যটন বিভাগকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে নজরুল গবেষণা ও কবির জীবনদর্শন বিষয়ে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দুই গুণী ব্যক্তির হাতে নজরুল পদক ও সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী নজরুল স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করেন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
বাংলা সাহিত্যে নজরুল ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। তাঁর লেখনী ছিল অত্যন্ত সাহসী ও প্রতিবাদী। উপনিবেশিক শাসন, সামাজিক বৈষম্য ও ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর কবিতা ও গান সাধারণ মানুষের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল। বিশেষ করে তরুণ সমাজ তাঁর লেখায় খুঁজে পেয়েছিল প্রতিবাদের ভাষা।
নজরুলের সাহিত্যকর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাম্যের চেতনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ সমান। তাঁর লেখায় ইসলামী সংস্কৃতির পাশাপাশি হিন্দু ঐতিহ্যেরও গভীর উপস্থিতি দেখা যায়। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন সোচ্চার।
শৈশব থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে নজরুলকে। জীবনের বিভিন্ন সময়ে নানা পেশায় যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ১৯১৭ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও অংশ নেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ এবং জীবনের শেষভাগে দীর্ঘ অসুস্থতাসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর সৃষ্টিশীলতা থেমে থাকেনি।
১৯২২ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত কবিতা বিদ্রোহী বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারার সূচনা করে। একই সঙ্গে তিনি প্রায় চার হাজার গান রচনা ও সুরারোপের মাধ্যমে বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। সাম্য, মানবতা, প্রেম, প্রতিবাদ ও ধর্মীয় সম্প্রীতির বাণী তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের প্রধান উপজীব্য।
নজরুলের প্রথম গদ্য রচনা ছিল ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’, যা ১৯১৯ সালে সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পের মধ্যে রয়েছে ‘হেনা’, ‘ব্যথার দান’, ‘মেহের নেগার’ ও ‘ঘুমের ঘোরে’। ১৯২২ সালে প্রকাশিত অগ্নিবীণা বাংলা কাব্যে নতুনত্বের সূচনা করে। এ কাব্যগ্রন্থের ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘আগমনী’, ‘বিদ্রোহী’ ও ‘কামাল পাশা’ কবিতাগুলো ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এছাড়া বাংলা কাব্যে ইসলামী সংগীত ও গজলের নতুন ধারা প্রবর্তনেও নজরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর রচিত নজরুলগীতি আজও সমান জনপ্রিয়। শিশুতোষ কবিতা, শ্যামাসংগীত ও ভক্তিগীতিতেও তিনি অনন্য অবদান রেখে গেছেন।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে সপরিবারে আনা হয় কবিকে। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছানুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে বৈষম্য, বিদ্বেষ ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা যখন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, তখন কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে নজরুল কেবল একজন কবি নন, তিনি একটি চেতনার নাম। তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন আজও মানুষকে অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ও প্রেরণা জোগায়।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available